Receipt of caliphate (Hazrat Abu Bakar (R:)




 মহানবী হযরত মুহাম্মদ(সঃ) এর  ইন্তেকালের পর মুসলমানদের সামনে সর্বপ্রথম যে কঠিন সমস্যার উদ্ভব হল তা হল খলিফা নির্বাচন। রাসূলে কারীম (সঃ) যেমন মুসলমানদের নেতা ছিলেন, অন্যদিকে তেমনি তাদের শাসক এবং পরিচালকও  ছিলেন।
 সুতরাং তাদের অন্তর্ধানে একেবারে তারা নিজেদের ধর্মীয় নেতা ও  শাসক শূন্য হয়ে পড়ল। যেকোনো একটি ধার্মিক, সুশৃংখল  সম্প্রদায় তথা জাতির জন্য একজন সুযোগ্য  ধর্মীয় নেতা ও উপযুক্ত  শাসকের প্রয়োজন।
 মহানবী হযরত মুহাম্মদ(সঃ) এর  ইন্তেকালের পর এখন কে সেপদেম রবি তো হবেন তা নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে কিছুটা মতানৈক্য ও বিতর্ক সৃষ্টি হল। 
 মুসলমানদের মধ্যে  মক্কার মুজাহিদ ও মদিনার আনসার এ  দুটিই প্রধান ছিলেন।  মক্কা থেকে যে সকল মুসলিম হিজরত করে এসেছিলেন তারাই মুজাহিদ  আর মুজাহিদদেরকে  যারা আছে দিয়েছে তারাই আনসার।
  এই দুই শ্রেণীর মধ্যে  থেকে প্রবলভাবে খেলাফতের  দাবি উত্থিত হল। এসমস্ত মুসলমানগন এ বিষয়ে একমত ছিলেন যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ(সঃ) এর লাশ জমির উপরে থাকতে খলিফা নির্বাচিত হওয়া দরকার।
 কিন্তু হযরত আলী ভিন্নমত প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন আগে দাফন কাপন হোক পরে খলিফা। এদিকে মুজাহির ও আনসারদের মধ্যে বিভিন্ন যুক্তি প্রদর্শন অব্যাহত রইল। 
বিজ্ঞ কিছু সংখ্যক লোক বললেন, দুই দুইজন গোত্র থেকে খলিফা নির্বাচন করা হোক।
 আনসারদের অনেক সুখের ভিতর হযরত আবু বকর (রাঃ) বললেন, প্রিয় আনসার ভাইগণ- আপনাদের দান  ও ত্যাগ  সম্পর্কে বিশেষ করে আপনাদের মর্যাদা সম্পর্কে মুজাহির মুসলিমগণ মোটেই  অবগত নগেন ।  আপনাদের উদারতা ও মহানুভবতা  চিরদিন তারা স্মরণ রাখবেন। এবং ইতিহাসেও ইহা স্বর্ণাক্ষরে  লিখিত থাকবে। আপনার নবীকে ও উহার উম্মতদেরকে আশ্রয় দিয়েছেন তাদের সহযোগিতা করেছেন এ কথা কোনদিন তারা ভুলবেন না।
 আর সাথে সাথে একথাও সত্য যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)  সর্বপ্রথম  তাদের কাছেই  করেছিলেন।  তারাই সর্বপ্রথম আল্লাহর দান করেছিলেন। যার জন্য  বিধর্মীদের হাতে অকথ্য নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল।
 শুধু তাই নয় তারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)এর  বংশোদ্ভূত। তাদের সহিত তার রক্তের সম্পর্ক রয়েছে সুতরাং খেলাফতের ব্যাপারে তাদের দাবি আপনাদের তুলনায় মোটেই দুর্বল নয়। বরং প্রবল। আমি মনে করি, খলিফা তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হওয়া উচিত।  অবশ্য সমস্ত কাজ আপনাদের  এবং আমাদের আমাদের পরামর্শ নিয়েই সম্পন্ন করবেন। 
হযরত আবু বকর (রাঃ)  এর  এরূপ বক্তব্যের পরও  আনসার কোন তাদের দাবি প্রত্যাহার করলেন না। বরং তাদের নেতা বলে ফেললেন আমাদের পক্ষ থেকে নির্বাচন না হলে দুই পক্ষ থেকে দুজন খলীফা  নির্বাচন করা হোক।তাদের এ কথার জবাবে আবুওবাদা (রাঃ)  বললেন, আনসার ভাইগণ! দুজন খলিফা হলে হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুজনের মতভেদের কারণে নিজেদের মধ্যে এমন সমস্যা ও বিভেদ সৃষ্টি হবে যার ফলে আমাদের ইসলামী  চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে পড়বে ।

এভাবে অনেকক্ষণ তর্কবিতর্কের পরে আনসার দেবে এক নেতা দাঁড়িয়ে বললেন, আনসার ভাই কোন! আমরা আল্লাহর রাসূল (সঃ)  কে সহযোগিতা করেছি আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে,  খেলাফত লাভের উদ্দেশ্যে নয়। যেহেতু নবী ছিলেন কুরাইশ বংশের সেহেতু তার অবর্তমানে তার স্থলাভিষিক্ত সেই কুরাইশ বংশ থেকে যুক্তিযুক্ত।
 অনেকক্ষণ পর এবার কিছুটা নমনীয়তা প্রদর্শন করে নিজেদের দাবি প্রত্যাহার করে নিতে শান্তভাব ধারণ করলেন । হযরত আবু বকর (রাঃ)  বললেন, আমার বিবেচনায় হযরত ওমর ফারুক অথবা হযরত ওবায়দা খলিফা হওয়ার যোগ্য ব্যক্তি। এদের মধ্যে যেকোনো একজনকে খলিফা নির্বাচন করা উচিত।
হযরত আবু বকর (রাঃ) এর  একথা  বলার পরেই আবু বললেন, হযরত আবু বকর (রাঃ) এর বর্তমানে আমাকে খলিফা  কিছুতেই মানায় না। হযরত ওমর(রাঃ)  বললেন , হযরত আবু বকর (রাঃ)  আপনি আমার অপেক্ষা অনেক গুণের যোগ্য ব্যক্তি। মুজাহিদদের মধ্যে থেকে  রাসূল (সঃ)  এর সর্বশ্রেষ্ঠ  সহচর  ও বন্ধু আপনি। তাছাড়া তার জীবিত অবস্থায় আপনি নামাজের ইমামতি করেছেন। ইহা আপনার যোগ্যতার প্রমাণ। অতএব,  হে আবু বকর (রাঃ) আপনি আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। আমরা আপনার হাতে হাত মিলিয়ে খলিফা নির্বাচন করে লই।
 হযরত ওমরের (রাঃ) এ বক্তব্যের পরেও  আবু বকর (রাঃ) হাত বাড়ালেন না। তখন হযরত ওমরের (রাঃ) ভাবলেন খলিফা নির্বাচন বিলম্ব করলে আরো তর্ক বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। তিনি আর এক মুহুর্ত দেরি না করে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর  হাত টেনে নিয়ে তাতে হাত রেখে হলেন দেখাদেখি হযরত আবু  ওবায়দাও বায়াত হলেন। পরে পর্যায়ক্রমে সকলেই তার হাতে বায়াত গ্রহণ করলেন।
হযরত আবু বকর (রাঃ)খলিফা নির্বাচিত  হওয়ায়  ইসলামের উপর থেকে দূর্যোগের ঘনঘটা অপসারিত হয়ে গেল। এভাবে খলিফা নির্বাচনের কাজ সমাধা করে সকলে মিলে হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর  কাফন-দাফন কার্য সম্পাদন করলেন। এরপর দিন আপামর জনসাধারণের বায়াত গ্রহণ সুসম্পন্ন  হল।
 অতঃপর হযরত ওমর ফারুক(রাঃ)  সম্ভবত জনসাধারণকে লক্ষ্য করে ভাষণ দিলেন। তিনি জনসাধারনকে উদ্দেশ্য করে বললেন- নুরুল্লাহ সিদ্দিকী আকবর আবু বকর (রাঃ) কে আমরা খলিফা নির্বাচন করেছি। তিনি রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর কর্মময় জীবনের প্রধান সহযোগী ছিলেন। আসুন আমরা সকলে মিলে তার আনুগত্যে অবিচল থেকে নবোদ্যমে পথ চলবার দৃঢ় শপথ গ্রহণ করি । হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) বাসন শেষে হযরত আবু বকর (রাঃ) মুসলিম বৃন্দের সর্বপ্রথম খলিফা হিসেবে মসজিদে নববীতে  রাসূলে কারীম (সঃ)  মিম্বারে দাঁড়িয়ে জনসাধারণকে অবগত করাতে ভাষণ দিলেন। 
হে  মুসলিম ভাইগণ!আপনারা জেনে রাখুন খেলাফতের জন্য আমার একটুও আগ্রহ ছিল না। এ কথা আমি কখনো চিন্তাও করি নাই । ইহার আশাও করি নাই, বরং এ দায়িত্ব থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছিলাম। যেভাবে হোক দায়িত্ব  যখন অর্পিত হয়েছে যথাযথ ভাবে আমাকে পালন করতে হবে। অবশ্য আল্লাহর রহমত না হলে কিছুতেই এক কঠিন দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
 আমি আপনাদের সহযোগিতা কামনা করি। আমি যখন  আল্লাহ ও রাসূল (সঃ) এর পথ ভ্রষ্ট হয়ে বিপথে পা বাড়ায় তখনই আপনারা আমার কাজের প্রতিবাদ করবেন। আর যদি আমার কোন ভুল ত্রুটি হয় সাথে সাথে আপনারা তা সংশোধনের চেষ্টা করবেন।  এ বলেই আমি আমার বাসার শেষ করছি। এগরার কয়েকদিন পরে হযরত আলী (রা)তার নিকট স্বইচ্ছায় বায়াত গ্রহণ করলেন।

 হযরত আলী (রাঃ) এবং  হযরত আবু বকর (রাঃ)  এর মধ্যে কথাবার্তা
 হযরত আলী (রাঃ) এবংখলিফা  হযরত আবু বকর (রাঃ)  এর  দরবারে উপস্থিত হয়ে তার প্রতি যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করে এবং  উভয়ের মধ্যে কুশল বিনিময়ের পর খোলা মনে আলাপ আলোচনা করলেন। অতঃপর,  বাইয়াতের প্রসঙ্গ তুলে বললেন ভাই, আবু বকর! আপনি আমার তুলনায় বায়োজ্যেষ্ঠ  ব্যক্তি হিসেবে আমি আপনাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করি। আর আপনার  সাফল্য ও কর্মদক্ষতার  কথাও  সর্বজন বিদিত।  আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে  আজ আপনি যে সম্মানিত পদমর্যাদা লাভ করেছেন সেজন্য আপনার প্রতি আমার মনে কোন ক্ষোভ বা বিদ্বেষ নেই। সত্য কথা বলতে কি আমার ধারণা হযরত রাসূলে কারীম (সঃ)  এর ঘনিষ্ঠতম আত্মীয় হিসেবে খলিফার  পদ ন্যায়তঃ আমার প্রাপ্য ছিল।  আপনার উক্ত পদ  লাভে আমি   সে  প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

 হযরত আলী (রাঃ) এর কথা শ্রবণ করে  হযরত আবু বকর (রাঃ)   কেঁদে ফেললেন। তিনি বললেন, ভাই আলী (রাঃ)  আমি আল্লাহর কসম করে বলছি- রাসূলে কারীম (সঃ)  এর পরিবার পরিজন এবং আত্মীয়-স্বজন আমার কাছে আমার নিজের পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজন থেকে অধিক প্রিয় এবং তাহারা আমার নিকট অত্যন্ত সম্মানিত ও শ্রদ্ধার পাত্র আপনাকে আমি নিশ্চিত রূপে বলছি, খেলাফতের প্রতি আমার মোটেও আগ্রহ ছিল না এবং এখনো নাই। এই কঠিন দায়িত্ব আমার উপরে এরূপ আমার অনিচ্ছাসত্ত্বেও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।  সত্তিকারভাবে  বলছি এখনো দায়িত্ব থেকে আমি এড়িয়ে যেতে পারলে খুশি হতাম। কিন্তু জনসাধারণের ইচ্ছা অনুযায়ী আমি এখনো পদে বহাল আছি। 
 হযরত আলী (রাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) এরূপ অকপট ও  আন্তরিকতাপূর্ণ বক্তব্যে নিতান্ত  সন্তুষ্ট হলেন এবং হযরত আবু বকর (রাঃ)  এর  প্রতি মনে যে একটি প্রশ্নের উদয় হতে যাচ্ছে তা অন্তর্নিহিত হয়ে গেল। অতঃপর তিনি এ ব্যাপারে দ্বিধাহীন চিত্তে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহণ করলেন।
 ভুল ত্রুটি সংশোধন যোগ্য

”ধন্যবাদ”

0 Comments

আমার ব্লগ তালিকা