ইসলামে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর ভূমিকা অপরিসীম।
হযরত আবু বকর (রাঃ) জীবনের প্রথম থেকেই পরোপকার ও জনসেবা অদ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন। অন্যের দুঃখ দেখলে তিনি কাতর হয়ে পড়তেন। জনসেবা ও সমাজ সেবায়ও তিনি শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। নিঃস্ব ও দরিদ্রকে তিনি মুক্ত হস্তে দান করতেন। তার অপূর্বদানের উসিলায় বহু লোক বহুভাবে উপকৃত হয়েছে। সত্যি বলতে কি হযরত আবু বকর(রাঃ) এর দানের কোন তুলনা ছিল না।
ইসলামের উদ্দেশ্যে দান করার সময় হযরত আবু বকর(রাঃ) নিজের প্রয়োজন ও পরিবার- পরিজন এর কথা পর্যন্ত ভুলে যেতেন।
কৃচ্ছ সাধনায় হযরত আবু বকর (রাঃ)
হযরত আবু বকর(রাঃ) খেলাফত পদ লাভের পড়ও কাপড়ের গাঠরি মাথায় বহিয়া বাজারে গিয়ে বিক্রয় করতেন, কারণ তার ইচ্ছা ছিল যে, রাজকীয় কোষাগার থেকে তিনি নিজের জন্য কিছু খরচ করবেন না। সুতরাং ব্যবসার দ্বারা কিছু উপার্জন করতঃ তার দ্বারা সংসার পরিচালনা ছাড়া তার গন্তব্য ছিল না। কিন্তু হযরত ওমার (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ) দেখলেন তার কাজ বিঘ্নিত হবে। অতএব বাইতুল মালের তহবিল থেকে কিছু পরিমান ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করে দেন।
তাদের পীড়াপিড়িতে উহা গ্রহন করলেও এ ব্যপারে অত্যাধিক মিতব্যয়িতার পরিচয় প্রদান করেন। তাঁর জন্য যে পরিমান ভাতা প্রদান করা হত , তা থেকে খরচ করে কিছু কিছু বাঁচিয়ে তা আবার তিনি বাইতুল মালে জমা দিয়ে দিতেন।
বদরের যুদ্ধে আবু বকর (রাঃ)
হযরত রাসুলে কারীম (সঃ) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পরও মক্কার কাফের কুরাইশগণ তাদের অসৎ আকাক্সক্ষা থেকে বিরত হয় নাই। ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তারা আরও অধিক চেষ্টা চালিয়েছে, একারণে তাদের সাথে মুসলমানদের বার বার যুদ্ধ হয়েছে। এসব যুদ্ধে সর্বত্রই মুসলমানদের জনশক্তি ও অস্ত্রশক্তি ছিল কাফেরদের তুলনায় একেবারে নগন্য । তুবও আল্লাহর অসীম কৃপায় প্রায় প্রতিটি যুদ্ধে মুসলমানগন জয়ী এবং কাফেরগণ পরাজিত হয়েছিল। এ সকল যুদ্ধে হযরত রাসূলে কারীম (সঃ) এর প্রধান সহযোগী হিসেবে হযরত আবু বকর (রাঃ) অংশগ্রহণ করেছিলেন।
বদরের যুদ্ধে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং তার সহকারি হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন আবু বকর ও হযরত আলী (রাঃ) এর উপর। এ যুদ্ধে আবু বকরের পুত্র পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কেননা তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন না।
ওহুদ ও হুনাইনের যুদ্ধে আবু বকর (রাঃ)
ওহুদ ও হুনাইনের যুদ্ধে মুসলমানগন হযরত রাসূলে কারীম (সঃ) এর উপদেশ পালনে সামান্য ত্রুটি এবং শৈথিল্য প্রদর্শন করে ভীষণ বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। যুদ্ধে এক পর্যায়ে তারা দিশেহারা কাপুরুষতা প্রদর্শনের উপক্রম করেছিলেন। কিন্তু এই যুদ্ধ দু’টিতেও হযরত আবু বকর (রাঃ) বর্ণে বর্ণে রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর নির্দেশ পালন করে একান্ত অবিচলতার নিদর্শন দেখিয়েছিলেন। তিনি সর্বদা রাসূলে কারীম (সঃ) এর পাশে থাকতেন। ওহুদের যুদ্ধে রাসূলে কারীম (সঃ) দান্দান মোবারক শহীদ হয়েছিল। এ সময় হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে প্রথম দেখতে পেয়েছিলেন এবং অন্যান্য সহযোগীদের সাহায্যে তাকে যুদ্ধের স্থান থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
খন্দকের যুদ্ধে হযরত আবু বকর (রাঃ)
খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানগন মদিনায় রক্ষণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এই যুদ্ধে শত্রু পক্ষয়ীগণ বিরাট বাহিনী নিয়ে মদিনায় অভিযান করেছিল।
তাদের রন প্রস্তুতির সংবাদ পেয়ে রাসূলে কারীম (সঃ) সাহাবাদেরকে নিয়ে পরামর্শ সভার আয়োজন করেন। তাতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, রাসূলে কারীম (সঃ) এবার বাইরে অগ্রসর না হয়ে মদিনা থেকে সৈন্যবাহিনীকে প্রতিরোধ করবেন । বিচক্ষণ সাহাবী সালমান ফারসির(রাঃ) এর পরামর্শক্রমে মদিনার তিন পাশে প্রশস্ত এবং গভীর পরিখা খনন করা হয়, যাতে শত্রু বাহিনী ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে।
পরিখা খননের পর সাহাবীদেরকে বিভিন্ন স্থানে নিযুক্ত করা হয়েছিল। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বিশেষ দক্ষতার সাথে সৈন্যদের নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। এ যুদ্ধে জয়লাভের মুলে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর অবদান কম ছিল না।
হোদায়বিয়ার সন্ধিতে হযরত আবু বকর (রাঃ)
ষষ্ঠ হিজরীতে মহানবী (সঃ) জিলকদ মাসে মুসলমানদের বিরাট একটি দলসহ ওমরা পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওনা করেন। মক্কার কাফেরগণ এ সংবাদ পেয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, যেকোনো মূল্যে তারা মুসলমানদেরকে প্রতিহত করবে।
রাসুলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে নিয়ে যুল হলায়ফা নামক স্থানে পৌঁছে মক্কার অভ্যন্তরীণ অবস্থা অবগত হওয়ার জন্য তথ্য প্রেরণ করলেন। তারা ফিরে এসে কাফেরদের উক্তরূপ রন প্রস্তুতির কথা জানালে রাসুলুল্লাহ (সঃ) সাহাবাদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। বিভিন্ন জনে বিভিন্ন পরামর্শ দিলেন। আবু বকর (রাঃ) বললেন, আমরা তো কুরাইশদের সাথে এই সময় যুদ্ধ করতে আসেনি, এসেছি শুধু খানায় কাবা জিয়ারত করতে। অতএব আমাদের অগ্রসর হওয়া উচিত। যদি তারা আমাদের বাধা প্রদান করে তাহলে আমরা মোকাবেলা করবো। নতুবা আমরা আমাদের কাজ সেরে চলে আসবো। রাসুলুল্লাহ (সঃ) আবু বকর (রাঃ) এর প্রস্তাব সমর্থন করলেন।
মুসলমানগন যখন হোদায়বিয়ার কাছে উপনীত হলো সে সময় বুদায়িল ইবনে ওয়ারাকা খাজায়ী কতিপয় লোকসহ রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, কাফেরগণ কিছুতেই আপনাদের কে মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না। তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বললেন আমরা এখানে যুদ্ধ করতে আসিনি সুতরাং তাদের সাথে আমরা সন্ধি করতে রাজি আছি। শেষ পর্যন্ত কাফের কুরাইশদের সাথে সন্ধি হয়েছে। এ সময় রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর কাছে হযরত আবু বকর (রাঃ) সর্বদা নিয়োজিত ছিলেন।
হ্বজের নেতৃত্বেআবু বকর (রাঃ)
নবম হিজরীতে মদিনা থেকে মুসলমানগন প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে হজ্জ করতে মক্কায় আসেন। ঘটনাক্রমে তখন রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে মদিনার কতগুলো জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এ কারণে তার পক্ষে হজ্ব যাত্রীদের নেতৃত্ব দান করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে হযরত আবু বকর(রাঃ) তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে এই অতি সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করেন।
বিদায় হজ্বে হযরত আবু বকর (রাঃ)
দশম হিজরি সনে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম তার জীবনের শেষ হওয়া সমাপন করেন। এ হজ্জ ইতিহাসে বিদায় হজ্জ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। আরাফাতের ময়দানে লক্ষাধিক সামনে অমূল্য ভাষণ দেন। এ ভাষণের অংশ বিশেষে তিনি যে বিষয় ইঙ্গিত দান করেন তার মর্ম অন্য কেউ উপলব্ধি করতে না পারলেও হযরত আবু বকর(রাঃ) তার অসীম প্রজ্ঞা বলে স্পষ্টরূপে বুঝতে পেরেছিলেন যে, হযরত রাসূলে কারীম (সঃ) এর অন্তিম মুহূর্ত আসন্ন, তিনি আর তাদের মধ্যে বেশিদিন নেই। এ কথা ভেবেই বাসের সময় তার দু'চোখ থেকে অশ্রু গড়ি তে পড়তে শুরু করে ।
কোরআনের ব্যাখ্যায় হযরত আবু বকর (রাঃ)
হযরত আবু বকর(রাঃ) তৎকালীন বিদ্বান ও শিক্ষিত লোকদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন। মক্কার কোন ব্যক্তি তার অপেক্ষা বড় বিধান ছিল না। একদিকে তিনি যেমন বড় বিদ্বান ছিলেন, অন্যদিকে তেমনি সাহিত্য ও কাব্য চর্চায়ও প্রধান সাহিত্যিক ছিলেন । জ্ঞান ও বুদ্ধিতেও ছিলনা ছিলনা মক্কায় তার জুড়ি ছিল না। বিভিন্ন বিষয়ে তার সর্বাধিক অভিজ্ঞতা ছিল। সবচেয়ে বড় কথা যে, তিনি এইরূপ জ্ঞানী ও বিদ্বান সত্বেও তার ভেতরে অহংকার ছিল না। বিনয় ও নম্রতা ছিল তার চরিত্রের ভূষণ। হযরত ওমরের মত বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ ব্যক্তিও হযরত আবু বকর(রাঃ) এর কাছে নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করতেন এবং তাকে প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান করতেন। পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যায়ও তার যোগ্যতা ছিল সমধিক। এ কারণে অনেক সময় প্রধান প্রধান সাহাবীগণও কোরআন পাকের বিভিন্ন আয়াতে তাৎপর্য অনুধাবন করতে তার নিকট আগমন করতেন।
রাসূলে কারীম (সঃ) এর অসুস্থ অবস্থায় হযরত আবু বকর (রাঃ)
রাসূলে কারীম (সঃ) বিদায় হওয়া শেষ করে মদিনা প্রত্যাবর্তন করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। ক্রমে ক্রমে তা রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবস্থা এমন পর্যায়ে যে, নামাজে ইমামতি করা পর্যন্ত তার অসম্ভব হয়ে পড়ে।
রাসূলে কারীম (সঃ) নিজের শারীরিক দুর্বলতা উপলব্ধি করে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা( রাঃ) কে নির্দেশ করেন যে,আবু বকর (রাঃ) কে বল, সে মুসলিমকে নামাজ পড়ে দিবে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা( রাঃ) তার পিতা এর প্রকৃতি ভালো করেই জানতেন। তিনি মনে করলেন কোমল হৃদয় আবু বকর(রাঃ) রাসূলে কারীম (সঃ)এর স্থানে নামাজে দাঁড়ালে স্থির থাকতে পারবেন না। কান্না আকুল হয়ে পড়বেন। তখন তার পক্ষে আর ইমামতি করা সম্ভব হবে না। এজন্য হযরত আয়েশা( রাঃ) নির্দেশ শুনেও বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সঃ) ইমামতির জন্য অন্য কাউকে বলুন। পিতাজি বড়ই নরম মানুষ। রাসূলে কারীম (সঃ) বিবি আয়েশা(রাঃ) পুনরায় বললেন, আবু বকরকে বলে দাও সেই নামাজ পড়াবে। এবার বিবি আয়েশা ভুলের জন্য লজ্জিত হলেন এবং আবু বকরকে রাসূলে কারীম(সঃ) এর নির্দেশে কথা জানিয়ে দিলেন।
হযরত আবু বকর (রাঃ) এর প্রতি নামাজে ইমামতি করার জন্য রাসূলে কারীম (সঃ) এর এ নির্দেশ সুদূর প্রসারী ইঙ্গিত বহন করেছিল। সাহাবীগণের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং রাসূলে কারীম (সঃ) এর অবর্তমানে সর্বপ্রথম খেলাফত পদে বরিত হওয়ার যোগ্যতার প্রমাণ ছাড়া আর কিছুই নয়।
0 Comments